ন্যায় দর্শন (বিদ্যোদয় ভাষ্য) - পণ্ডিত উদয়বীর শাস্ত্রী
ন্যায় দর্শন - বিদ্যোদয় ভাষ্য
পণ্ডিত উদয়বীর শাস্ত্রী
ভূমিকাঃ ভারতীয় দর্শনের মূল আলোচ্য আধ্যাত্মিক ও অধিভৌতিক বিষয়। এর মধ্যে ন্যায় দর্শনের প্রধান প্রতিপাদ্য হলো প্রমাণতত্ত্ব— জ্ঞানলাভের সঠিক উপায় ও সত্য নির্ণয়ের প্রক্রিয়া। ন্যায় সূত্রে উল্লিখিত ষোলোটি বিষয় আসলে প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ স্বরূপ স্পষ্ট করতে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে আত্মা মুখ্য প্রমেয় হিসেবে বিশেষ স্থান পেয়েছে। প্রমাণের মাধ্যমে আত্মার স্বরূপ চেনাই এর মূল লক্ষ্য।
প্রাচীন ঋষিরা তর্ককে দেবতাপ্রদত্ত জ্ঞানরূপে মান্য করেছেন। মনুসংহিতা বলেছে, তর্কের মাধ্যমেই ধর্মতত্ত্ব জানা যায়। তাই ন্যায়শাস্ত্রকে তর্কশাস্ত্রও বলা হয়। বিতর্কের মাধ্যমে সত্য প্রকাশ পায়, আর অনুমানের পদ্ধতি— প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয় ও নিগমন— এই দর্শনের অবদান। বৈশেষিক দর্শন যেখানে পদার্থের বিশ্লেষণ করে, ন্যায় দর্শন সেখানে তার জ্ঞানপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে— উভয়ই পরস্পর পরিপূরক।
দর্শনশাস্ত্রের জটিল বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য আচার্য উদয়বীর শাস্ত্রী বিশেষভাবে সমাদৃত। তাঁর রচনাবলীর সংরক্ষণ ও প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন শ্রী গোবিন্দরাম হাসানন্দের উত্তরাধিকারী শ্রী বিজয়কুমার, যা দর্শনপ্রেমী সমাজের জন্য এক মহৎ ও প্রশংসনীয় কর্ম।
person ভাষ্যকার পরিচিতি
দর্শন শাস্ত্রের অভূতপূর্ব বিদ্বান পণ্ডিত উদয়বীর শাস্ত্রী ১৮৯৫ সালের ৬ জানুয়ারী, রবিবার বুলন্দশহর জেলার বনৈল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রারম্ভিক শিক্ষা সংগ্রামের সময় শুরু হয়। তারপর ৯ বছর বয়সে ১৯০৪ সালের জুলাই মাসে তাকে সিকান্দারবাদ গুরুকুলে ভর্তি করানো হয়। পুনরায় উচ্চ শিক্ষার জন্য ১৯১০ সালে তিনি জ্বালাপুর মহাবিদ্যালয় গুরুকুলে ভর্তি হন। পুনরায় তিনি কোলকাতা থেকে (১৯১৫/১৯১৬) সালে ন্যায়তীর্থ তথা সাংখ্য-যোগতীর্থ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন। পুনরায় তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাস্ত্রী, বানারস থেকে বেদান্তাচার্য, গুরুকুল বিশ্বদ্যিালয় থেকে বিদ্যাভাস্কর আদি পরীক্ষাতেও সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। তাকে জ্বালাপুর বিশ্বদ্যিালয় গুরুকুল থেকে বিদ্যাবাচস্পতি উপাধী প্রদান করা হয়। জগন্নাথপুরীর ভূতপূর্ব শঙ্করাচার্য শ্রী ভারতী কৃষ্ণতীর্থ মহাশয় তার অপার পাণ্ডিত্য দেখে তাকে বেদরত্ন তথা শাস্ত্র শেবধি উপাধীতে ভূষিত করেন।
auto_stories বই পরিচিতি
ভারতীয় দর্শনের সার্বিক স্বরূপ
সমস্ত ভারতীয় দর্শন আধ্যাত্মিক ও অধিভৌতিক বিষয়ের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে। এগুলির মধ্যে ছয়টি বৈদিক দর্শন রয়েছে— ন্যায়-বৈশেষিক, সাংখ্য-যোগ, মীমাংসা ও বেদান্ত; এবং তিনটি অবৈদিক দর্শন— চার্বাক, আর্হত (জৈন) ও বৌদ্ধ দর্শন। যদিও সামগ্রিকভাবে সব দর্শনের আলোচ্য বিষয় আধ্যাত্মিক ও অধিভৌতিকতার অন্তর্গত, তবুও প্রতিটি দর্শন তার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে মৌলিক বিষয়ের কোনো একটি অংশ বা দিক নিয়ে আলোচনা করেছে এবং তা পূর্ণাঙ্গভাবে বিশদভাবে বর্ণনা করেছে। তবে আধ্যাত্মিক-অধিভৌতিকতার মৌলিক ভিত্তিকে কোনো দর্শনই উপেক্ষা করেনি। যেখানে অধিভৌতিকতা প্রধান, সেখানে আধ্যাত্মিকতা গৌণ; আর যেখানে আধ্যাত্মিকতা প্রধান, সেখানে অধিভৌতিকতার আলোচনা গৌণ হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শনগুলিকে বিচার করলে নিম্নলিখিত রূপরেখা ফুটে ওঠে:
ন্যায় দর্শনের মূল প্রতিপাদ্য: প্রমাণতত্ত্ব
ন্যায় দর্শনের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হলো 'প্রমাণ' (জ্ঞানলাভের সঠিক উপায়)। এই দর্শনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ অংশই প্রমাণের স্বরূপ ও তার প্রয়োগ পদ্ধতি নিয়ে আলোচিত হয়েছে। ন্যায়ের প্রথম সূত্রে যে ষোলটি বিষয়ের উল্লেখ আছে, তার মধ্যে 'প্রমেয়' (জ্ঞেয় বিষয়) ছাড়া বাকি সব বিষয়— যেমন 'সংশয়' ইত্যাদি— শুধুমাত্র প্রমাণের পূর্ণ ও নির্ভুল স্বরূপ উপস্থাপনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। প্রমেয়ও প্রমাণের লক্ষ্যক্ষেত্র হওয়ায় এর স্বরূপ পরিষ্কার করতে সহায়ক। প্রমাণের সার্থকতা বা সাফল্য তখনই, যখন এর মাধ্যমে জানা বিষয়— গ্রহণ বা বর্জনের মাধ্যমে— বাস্তবে তার সত্যিকারের রূপে পাওয়া যায়।
প্রমাণতত্ত্বে আত্মার মুখ্যতা
'আত্মা' ইত্যাদি প্রমেয় বিষয়গুলিকে গভীরভাবে দেখলে, তাদের মধ্যে কেবল 'আত্মা'-ই প্রধান বলে প্রতীয়মান হয়। বাকি সব— শরীর, ইন্দ্রিয়, অর্থ (গন্ধ, রস, রূপ, স্পর্শ, শব্দ), বুদ্ধি, মন, প্রবৃত্তি, দোষ (পাপ), প্রেত্যভাব (মৃত্যুর পরের অবস্থা), ফল (কর্মফল), দুঃখ, অপবর্গ (মোক্ষ)— সবই আত্মার সাথে সম্পর্কিত। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এগুলির সবই আত্মার জন্য ব্যবহৃত হয়। সূত্রকার (গৌতম) শাস্ত্রের প্রধান প্রতিপাদ্য 'প্রমাণ'-এর লক্ষ্যক্ষেত্রে 'আত্মা'-কে বিশেষ স্থান দিয়ে, তাকে এবং তার সাথে সম্পর্কিত পরিস্থিতিগুলিকে প্রমেয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ থেকে এটাও বোঝা যায় যে, সূত্রকার ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে প্রমাণের মাধ্যমে শরীরাদি থেকে ভিন্ন আত্মার স্বরূপ চিনে নেওয়াই মুখ্য। এমন সব বিশ্লেষণের প্রধান ভিত্তি হলো 'প্রমাণ'।
প্রাচীন কালে 'তর্ক' ও তার ঐশ্বরিক স্থান
ঋষি যাস্ক তাঁর নিরুক্ত গ্রন্থে একটি ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন, যা নিম্নরূপ: প্রাচীনকালে ঋষিগণের অবর্তমানে মানুষ দেবতাদের নিকট গিয়ে বলল— 'কো ন ঋষির্ভবিষ্যতি?' (আমাদের এখন ঋষি কে হবে?) তখন দেবতারা তাদেরকে তর্ক-ঋষি প্রদান করলেন— 'তেভ্য এতং তর্কমৃষি প্রায়চ্ছন্' (নিরুক্ত ১৩/১২)। এই তর্ককে লক্ষ্য করে ভগবান মনু বলেছেন:
মনুসংহিতা মতে তর্কের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধান-"যস্তর্কেণানুসন্ধতে স ধর্ম বেদ নেতরঃ।" (মনুসংহিতা ১২/১০৬)
অর্থাৎ: যিনি তর্কের মাধ্যমে অনুসন্ধান করেন, তিনিই ধর্মের তত্ত্ব জানেন, অন্যজন নয়।
তর্কের মাধ্যমে তত্ত্বজ্ঞান ও তার ব্যাবহারিকতা
এখানে 'তর্ক' বলতে প্রমাণ অনুসারে সত্য নির্ণয় করাকে বোঝায়। প্রমাণই ন্যায়শাস্ত্রের মূল বিষয় বা দেবতাস্বরূপ। সাধারণভাবে একে 'তর্কবিদ্যা' বা 'তর্কশাস্ত্র'ও বলা হয়। যতক্ষণ না বাদী ও প্রতিবাদী বিতর্কে অংশ নেয়, ততক্ষণ সত্য-অসত্যের সিদ্ধান্ত হয় না। এজন্যই প্রবাদ রূপ নিয়েছে— "বাদে বাদে জায়তে তত্ত্ববোধঃ" (বিতর্কের মাধ্যমে তত্ত্বজ্ঞান জন্মে)। এই শক্তির কারণে ন্যায়শাস্ত্র বিভিন্ন নামে ও রূপে দেশ-কালের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বে প্রসারিত হয়েছে। এটি লৌকিক ব্যবহারে যেমন উপযোগী, তেমনি ধর্মীয় ও দার্শনিক আলোচনায়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনুমানের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া (প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয় ও নিগমন— এই পাঁচ অঙ্গসহ) এই দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। সমস্ত দার্শনিক, ধর্মীয় ও ব্যবহারিক বিচার-বিশ্লেষণ ন্যায়দর্শনের নীতিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যথায়, দীর্ঘকাল ধরে চিন্তা করলেও তত্ত্বজ্ঞান রূপ নবনীত লাভ সম্ভব নয়।
ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শন পরস্পর পরিপূরক। বৈশেষিক দর্শন পদার্থ ও তাদের ধর্মের বিবরণ, সংযোগ ও স্বরূপ বিশ্লেষণ করে, অন্যদিকে ন্যায়দর্শন সেই পদার্থ ও ধর্মগুলো জানার ও বোঝার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে।
তর্কের যোগ্যতা: যাস্কের দৃষ্টিভঙ্গি
যাস্ক সাধারণ মানুষের তর্ককে 'তর্ক' বলে মানেন না। তিনি কেবল সেই ব্যক্তির চিন্তাকেই ঋষিসম্মত মনে করেন, যিনি বহুবিদ্যায় পারদর্শী, বহুশ্রুত, তপস্বী ও প্রসঙ্গানুযায়ী চিন্তনকারী— একজন আপ্তপুরুষ।
আচার্য উদয়বীর শাস্ত্রী ও দর্শনশাস্ত্রে তাঁর বিশেষতা
দার্শনিক সাহিত্য রচনায় নিপুণ, দর্শনশাস্ত্রের মর্মজ্ঞ পণ্ডিত সাহিত্যবাচস্পতি আচার্য উদয়বীর শাস্ত্রী তাঁর বিষয়ের সুপ্রতিষ্ঠিত বিদ্বান। দর্শনশাস্ত্রের মতো জটিল ও নীরস বিষয়কে উপস্থাপনে তাঁর শৈলীর বিশেষত্ব হলো— এটি পণ্ডিত থেকে সাধারণ মানুষের জন্যও সুবোধ ও আকর্ষণীয়, ফলে সবার জন্য সমানভাবে উপকারী।
আচার্যের রচনাবলীর সংরক্ষণ ও প্রকাশ উদ্যোগ
আচার্য উদয়বীর শাস্ত্রী রচিত সাহিত্য এতদিন শ্রী স্বামী বেদানন্দ তীর্থ প্রতিষ্ঠিত, শ্রী স্বামী বিজ্ঞানানন্দ কর্তৃক পোষিত ও শ্রী আচার্য উদয়বীর শাস্ত্রী প্রতিষ্ঠিত বিরজানন্দ বৈদিক (গবেষণা) সংস্থান দ্বারা প্রকাশিত হতো। আচার্যের অসুস্থতা ও সংসার ত্যাগের ফলে সংস্থানটি এখন নিষ্ক্রিয়। তবে এত উৎকৃষ্ট সাহিত্য সমাজের হাতছাড়া না হয়, তাই ভবিষ্যতে আচার্যের সমগ্র রচনা প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছেন গোবিন্দরাম হাসানন্দের উত্তরাধিকারী শ্রী বিজয়কুমার। গোবিন্দরাম হাসানন্দ প্রকাশন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহান গোভক্ত হাসানন্দের পুত্র ও শ্রী বিজয়কুমারের পিতা শ্রী গোবিন্দরাম, আর্য সমাজের সূচনালগ্নে। ন্যায়দর্শনের এই সংশোধিত সংস্করণটি সেই সংস্থা থেকেই প্রকাশিত হচ্ছে। শ্রী বিজয়কুমারকে অজস্র ধন্যবাদ ও আশীর্বাদ।
info বইয়ের বিস্তারিত তথ্য
downloadডাউনলোড করুন
আপনার পছন্দের ফরম্যাটে বইটি ডাউনলোড করতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন:
(ডাউনলোড লিঙ্ক কাজ না করলে বা কোনো সমস্যা হলে অনুগ্রহ করে মন্তব্য করুন।)
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন